অপূর্ণ আলোর গল্প | Bangla Story

শীত না হয়,  সোয়েটার দিয়েই কাটিয়ে দেবেন

লিখেছেন -একুয়া রেজিয়া

সাত’শ টাকা জমেছে মোট। হেলাল সাহেব ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে টাকাগুলো মানিব্যাগের ভিসিটিং কার্ড রাখার পকেটে ভাঁজ করে রেখে দিলেন। মানিব্যাগের এই পকেটে তিনি জমানো টাকা রাখেন। যাতে ভিজিটিং কার্ড সামনে থাকার কারণে টাকাগুলো চোখে না পরে, চোখে পরলেই খরচ হয়ে যাবে। সংসারে খরচের শেষ নেই। একের পর এক অভাব লেগেই থাকে। টুম্পার মায়ের চশমা সেদিন হুট করে ভেঙে গেলো, মাসের মাঝ দিয়ে নতুন চশমার ফ্রেম আর কাচসহ খরচ হয়ে গেলো প্রায় আট’শ টাকা। বাড়তি খরচ, কিন্তু চশমা না কিনেও তো উপায় নেই। টুম্পার মার কাচের পাওয়ার মাইনাস ফাইভ, চশমা ছাড়া সে অচল। প্রতি মাসেই একের পর এক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। খবরের কাগজের জন্যে মাসকয়েক আগেও যেখানে দুশ টাকা দিতেন এখন কাগজের দাম বেড়ে যাওয়াতে তিন’শ করে টাকা দিতে হয়। প্রায়ই মনে হয় খবরের কাগজ বাদ দিয়ে দিলে কিছু টাকা তো বেঁচে যায়, এই টাকা দিয়ে স্যাটেলাইট চ্যানেলের বিল দেওয়া যাবে। বিটিভি তো এখন আগের মত কেউ দেখে না, তাই ডিশ লাইন বাদ দেওয়ার উপায় নেই। টুম্পার মা টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান দেখে, টুম্পা- সাব্বির টিভি দেখে, তিনি নিজেও তো নিউজ চ্যানেলগুলোর নিয়মিত দর্শক। খবরের কাগজ বাদ দিলে ডিশ বিলের টাকা উঠে আসবে খবরের কাগজের বিল থেকে। আবার মনে হয় বাসায় একটা পত্রিকা আসবে না, সাব্বির ওর জে এস সি পরীক্ষার সব মডেল কোয়েশ্চেন এই পত্রিকা থেকে পেয়েছিলো বলেই তো এত ভালোভাবে পড়তে পেরেছে। নাহ কিছুতেই কোন হিসাব মেলে না। বড্ড গোলমাল লেগে যায় সব কিছুতেই।

হেলাল সাহেব দীর্ঘক্ষণ ধরে রুমাল দিয়ে তাঁর চশমার কাচ মুছলেন তারপর বুক পকেটে মানিব্যাগটা রেখে আলতো করে পকেটের উপর হাত বুলালেন। সন্ধ্যা ছয়টা বাজে আর একটু পরেই অফিস ছুটি হয়ে যাবে। শীতকাল চলে এসেছে, বিকেল পাঁচটার পরেওই আজকাল ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে পড়ে। ছয়টা বাজলে চারদিক ঘন অন্ধকারে ঢেকে যায়। আজকে তিনি একটু ঢাকা কলেজের উলটা পাশের নূরজাহান মার্কেটে যাবেন অফিস শেষ করে। বছর দুয়েক আগে হেলাল সাহেবের একমাত্র খয়েরী রঙের সোয়েটারটা এক লোকাল বাসের সিটের হাতলে লেগে অনেকটুকু ছিঁড়ে যায়, টুম্পার মা সেলাই করে দেওয়ার পরেও সেই ছেঁড়া অংশটুকু খুবই দৃষ্টিকটু ভাবে তাকিয়ে থাকে। হেলাল সাহেব তবুও আর কোন সোয়েটার নেই বিধায় সেই সোয়েটার কিছুদিন অফিসে পরে এসেছিলেন। দিন দুয়েক পরার পরেই ক্যাশের মাসুদ সাহেব ক্যান্টিনে গিয়ে তাঁর সোয়াটারের সেলাই করা অংশে হাতের তর্জনি দিয়ে একটি মোক্ষম খোঁচা মেরে বলে ভ্রু নাচিয়ে, রসিকতার স্বরে বলে বসলেন, হেলাল ভাইয়ের কি শীতকালে অনেক গরম লাগে নাকি? এই জন্যে সোয়েটারে বাতাস ঢোকানোর জন্যে ছিঁড়ে রেখেছিলেন? আশেপাশের মানুষ এই রসিকতায় প্রচুর হেসেছে। হেলাল সাহেব এরপর দিন থেকে সারা শীতকালে শার্টের নিচে সোয়াটার পরে অফিসে গিয়েছেন।

সময়ের কাঁটা ছুঁয়েছে সন্ধ্যা। হেলাল সাহেব ধীর পায়ে পা রাখলেন অফিসের বাইরে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলেন নূরজাহান মার্কেটে কীভাবে যাবেন? বাস অথবা রিক্সায় যাওয়া যায়। খরচ কমাতে বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাসস্ট্যান্ডে যেতে সময় লাগে প্রায় ৮ মিনিট। পথের ধারে থাকা ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে দেখলেন এক পথশিশু গায়ে ধূলো মেখে মনের আনন্দে ফুটপাতে বসে খেলছে। হাতের কাঠি দিয়ে, গোটা গোটা হাতে কাঠি শক্ত করে ধরে কি যেন একটা মাটিতে লেখার চেষ্টা করছে। হেলাল সাহেবের মনে হলো, একদিন সাব্বির ও টুম্পাও তো এমন ছিলো। তখন শব্দ করে একটি বাস ব্রেক কষায় চমকে উঠলেন। চোখ তুলে দেখলেন, মাত্র ২৫-৩০ গজ দূরে টিকেট বিক্রেতা ও মানুষের মিছিল দেখা যাচ্ছে।

বাসট্যান্ডে খানিকটা সময় অপেক্ষা করলে লাগলেন হেলাল সাহেব। হঠাৎ করেই মনে হলো, না থাক আজ আর ঢাকা কলেজ গিয়ে কাজ নেই। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাসায় ফিরলেই ভালো হয়। রাস্তার উল্টো দিকের স্ট্যান্ডে গিয়ে বাসায় যাওয়ার বাসের জন্য অপেক্ষা করলেন। বেশ কিছু সময় পর বাস পেলেন। অনেক মানুষের ধাক্কা সামলে নিজের শরীরকে ঠেলে ঠুলে বাসে ঢুকিয়ে নিলেন। বাস চললে লাগলো। যাত্রা কষ্টের হলেও, ঘরে ফেরার আনন্দে মনে সুখ অনুভূতি থাকে হেলাল সাহেবের। নিয়ম মেনে পরদিন আবারো সকাল ৯টায় অফিসে আসলেন। ধূসর সকাল। শীতের বাতাসে যেন নগরীর বাড়ি ঘর, পথঘাটগুলোও হু হু করে কেঁপে উঠছে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আজ বুদ্ধি করে সোয়েটারের নিচে আরেকটি পুরানো গেঞ্জি পরেছেন তিনি। সোয়েটারের উপরে শার্ট। অন্তত আগের চেয়ে আজ কিছুটা কম শীত লাগবে।

সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে দিন কেটে গেলো। শীতের দিনগুলো নাকি ছোট হয়, অথচ হেলাল সাহেবের মনে হলো একটি দীর্ঘতম দিন পার করলেন তিনি। লাঞ্চ করার সময় পেলেন চারটার পর। বিকেল সাড়ে পাঁচটা অফিসের ফাইলগুলো জমা দিয়ে, ডেস্কের ড্রয়ারে তালা দিতে না দিতেই পিয়ন এসে বললো, স্যার, ম্যানেজার স্যার আপনাকে খুঁজে গেছেন। কিছুটা চিন্তিত হয়ে ম্যানেজারের ঘরের দরজায় টোকা দিলেন। ম্যানেজার ভেতর থেকে শান্ত স্বরে বললেন, হেলাল সাহেব ভেতরে আসুন।

কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কামরার ভেতরে ঢুকলেন। ম্যানেজার বললেন, হেলাল সাহেব, করিম সাহেব বেশ কিছুদিন ধরে অফিসে আসছেন না, কী যেন পারিবারিক সমস্যা নাকি অসুস্থতা। আপনার নিজের করা কাজগুলো তো আজকের মত শেষ তাই না? হেলাল সাহেব জবাব দিলেন, জ্বি স্যার। ম্যানেজার কিছুটা আদেশের সুরে বললেন, করিম সাহেবের কাজগুলো কী অবস্থায় আছে দেখুন। দুইটা ব্যাংকে লোনেরর ফাইল আপডেট করে ফেলুন। ইট’স ইমার্জেন্সি। কাজ গুছিয়ে তারপর বাসায় ফিরবেন। আর সন্ধ্যায় ভরপেট নাস্তা করবেন আজকে, আমি নাস্তার রিকুইজিসন পাস করে দিচ্ছি আপনার নামে। হেলাল সাহেব কয়েক মূহুর্ত নীরবতা থাকলেন। ম্যানেজার শান্ত ভঙ্গিতে বললো, কোন সমস্যা হেলাল সাহেব ? জবাবে তিনি মাথা দুলিয়ে না সূচক জবাব দিলেন। কামরা থেকে বেরিয়ে হেলাল সাহেব বুঝতে পারলেন, আজো সোয়েটার কিনতে যাওয়া হবে না। শান্ত পায়ে নিজের চেয়ারে ফিরলেন। বসে চোখ ফেললেন, পাশে রাখা ক্যালেন্ডারের দিকে। দেখলেন আগামীকাল মঙ্গলবার, ঢাকা কলেজ ও নিউ মার্কেট এলাকার সব দোকানপাট কাল বন্ধ।

রাত ১০টার পর অফিসের কাজ শেষ করে, বাইরে বেরিয়ে হেলাল সাহেব বুঝতে পারলেন তার শার্টের হাতার ভেতর দিয়ে বেশ ঠাণ্ডা ঢুকছে। দুই এক দিনের মধ্যেই হয়তো আরও শীত জেঁকে বসবে। বুক থেকে দীর্ঘ নি:শ্বাস বেরিয়ে এলো, স্বাদ আর সাধ্যের হিসাব কোনদিন তিনি মেলাতে পারলেন না।

বুধবার বিকেল। হেলাল সাহেব অফিসের কাজ শেষ করলেন সন্ধ্যা সাতটায়। অফিস থেকে বের হতে হতে সাড়ে সাতটা বেজে গেলো। মার্কেটে যেতে যেতে মার্কেট বন্ধ হয়ে যাবে।

বৃহস্পতিবার হেলাল সাহেব ম্যানেজার স্যারকে বলে পাঁচটার দিকে ছুটি নিলেন। সোয়েটার কিনে জলদি বাসায় ফিরবেন। আজ তার মন ভালো নেই। এই শুক্রবারেও অফিস করতে হবে। একাউন্টসের করিম সাহেব আজ অফিসে এসেছিলেন। করিম সাহেবের এগারো বছরের ছোট ছেলে আবিরের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চিকিৎসার জন্যে প্রায় ৭০/৮০ লক্ষ টাকা দরকার। করিম সাহেব টাকা যোগার করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন অনবরত। আজকে ম্যানেজার স্যারের রুম থেকে বেশ অনেকক্ষণ করিম সাহেবের কান্নার শব্দ শোনা গিয়েছে। “ছোট চাকরী করি, বেতন কম পাই। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না”। “আমার ছোট ছেলেটা সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়, খুব সুন্দর ছবি আঁকে”। “আমাকে সাহায্য করুন” থেকে থেকে এ কথাগুলো বার বার শুনে গিয়েছে আজ অফিসের সবাই।

অফিসের ফাইলগুলো ড্রয়ারে লক করে বের হবার সময় দেখলেন, অফিসের ক্যান্টিনে, দরজার বাইরে করিম সাহেবের ছেলে আবিরের ছবিসহ সাহায্য চাই আবেদনের কাগজ সেঁটছে পিওন।

আবিরকে একটি সোনালী ভোর দেখাবার জন্য…

আমার পুত্র সন্তান পঞ্চম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী আবির (১২) জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। ব্লাড ক্যান্সার নামক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত আবির। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় সে এখন গুরুতর অসুস্থ, তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এ অবস্থায় গত ১ মাস আশা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে চিকিত্সা করানো হলেও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে সে।

ডাক্তারদের পরামর্শ, মরণব্যাধিতে আক্রান্ত আমার ছেলেটিকে বাঁচাতে দ্রুত উন্নত চিকিত্সা প্রয়োজন। আর এজন্য প্রয়োজন অনেক টাকার। অসহায় দরিদ্র বাবার যতসামান্য যা ছিল, তা দিয়ে সন্তানের চিকিৎসা সম্ভব না। এ অবস্থায় আপনাদের কাছে মানবিক সাহায্যের আবেদন জানাতে বাধ্য হচ্ছি আমি।

একজন হতভাগ্য পিতার পাসে এসে দাঁড়ান।

কাগজের নিচে সঞ্চয়ী হিসাদার বিকাশ নম্বর আর একটা বাচ্চার সাদাকালো ছোট পাসপোর্ট সাইজের ছবি জুড়ে দেওয়া।

হেলাল সাহেব লেখাটা পড়ে অফিসের বাইরে চলে আসেন। অফিসের গেট ধরে বাইরে বের হবার সময় দেখলেন করিম সাহেব ব্যস্ত ভঙ্গীতে গেটের দারোয়ানের সাহায্য নিয়ে অফিসের নিচে সাহায্য চাওয়ার কাগজ লাগাচ্ছেন। এই বিল্ডিং এ অন্যান্য অফিস আছে, তাই মনে হয়। করিম সাহেবের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এই অল্প ক’দিনের তিনি বুড়িয়ে গিয়েছেন। বিধ্বস্ত চেহারা, উস্কোখুস্কো চুল, চোখের দৃষ্টি দিকভ্রান্ত নিঃস্ব মানুষের মত। করিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে হেলাল সাহেবের কেমন যেন মায়া লাগতে থাকে।

“হ্যালো, বাবা। এই যে, এই যে আমি বাসায় ফিরতেসি। কী খেতে মন চায় তোমার বলো? আমি আনবো বাবা। এই যে। হ্যাঁ হ্যাঁ সব ঠিক আছে। নসিলা খাবা? নাকি কমলা?”

হেলাল সাহেব নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে এ প্রান্ত থেকে করিম সাহেবের ফোনে বলা কথাগুলো শুনেন। বুঝতে পারেন, ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে করিম সাহেবের চোখ ভিজে এসেছে।

হেলাল সাহেব গেটের বাইরে গিয়ে একটু ঝুঁকে দেয়ালের কাগজটা আবার খুব যত্ন নিয়ে মন দিয়ে পড়েন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবির নামের বাচ্চাটার সাদাকালো ছবিটা দেখেন। গোলগাল মুখ, বোঁচা নাক আর তাঁর ছেলে সাব্বিরের মত বড় বড় চোখ আবিরের। স্কুলের সাদা শার্ট পরা ছবি। বুকের ভেতর টনটন করে উঠে তাঁর কেন যেন। মনে মনে কোথায় যেন করিম সাহেবের সাথে নিজের মিল খুঁজে পান তিনি। ভাবেন, আচ্ছা এই শহরে তো লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে, তাই না! প্রত্যেকে এক টাকা করে দিলেও তো বাচ্চা ছেলেটার জীবন বেঁচে যায়। জীবিত বাবার সামনে তাঁর মৃত ছেলের চেহারা দেখার মত নিষ্ঠুরতা মনে হয় আর কিছুই হতে পারেনা পৃথিবীতে। হেলাল সাহেব খুব যত্ন নিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ভিজিটিং কার্ডের পেছনে লুকানো টাকাগুলো বের করেন। ভাঁজ করে রাখা, একটা পাঁচশ আর দুটা সাতশ টাকার নোট। হয়ত খুব বেশি টাকা নয় আবার বলা যায় অনেক টাকা!

শেষ কথাঃ

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঠাণ্ডার প্রকোপ বাড়ছে। রাস্তার পথবাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে হেলাল সাহেবের ভীষণ ভালো লাগছে। হেলাল সাহেব আজ অফিস থেকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরবেন। ফোনে টুম্পার মাকে বলেছেন বাসায় ফিরতে দেরী হবে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই শীতের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস হেলাল সাহেবকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। একটু কেঁপে উঠে হেলাল সাহেব চিন্তা করলেন, আরেকটা শীত না হয়, শার্টের নীচে পরা সোয়েটার দিয়েই কাটিয়ে দেবেন। কী আসে যায় জীবনে? খুব কি বেশি কিছু আসে যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *